মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন ঐতিহ্য অন্বেষণের পথিকৃৎ – আজ ৬৭তম মৃত্যুবার্ষিকী বিনম্র শ্রদ্বায় স্বরন করছে পটিয়াবাসী

মুহাম্মদ রুশনী মোবারক
(সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

পুঁথি গবেষক মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মেধা, শ্রম, ঐকান্তিকতা, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে যিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অজানা অথচ অপরিহার্য ইতিহাস পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মচেতনা বৃদ্ধি, মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগসৃজন, দেশের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধিতে, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মমর্যাদা জাগানোর ক্ষেত্রে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদান চিরস্মরণীয়।প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও গবেষণায় অসাধারণ নিষ্ঠা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় প্রদান করেন তিনি। তাঁর সংগৃহীত পুঁথির সংখ্যা প্রায় দুই হাজারেও অধিক। ‘ইসলামাবাদ’ ও ‘আরাকান রাজ সভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’ তাঁর দুইখানি মৌলিক গদ্যগ্রন্থ। তাঁর সংগৃহীত বিপুল পুঁথি সম্পদের মুসলিম পুঁথিগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এবং হিন্দু পুঁথিগুলো রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে দান করে গেছেন। আজ ৩০ সেপ্টেম্বর মহান মনীষী মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ৬৭ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯৫৩-সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্বরন করছে পটিয়ার সর্বস্তরের জনগন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এ উপলক্ষ্যে স্বরনসভা সহ নানা আয়োজন করেছে।

সাহিত্য বিশারদ মুন্সি আবদুল করিম ১৮৬৯, মতান্তরে ১৮৭১ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন পটিয়া মহকুমার সুচক্রদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের একজন কীর্তিমান সাহিত্যপণ্ডিত মুন্সি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানের একজন বাঙালি সাহিত্যিক। প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ ও সাহিত্যের ঐতিহ্য অন্বেষণকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুন্সি আবদুল করিম। ‘মুন্সি’ তার বংশগত উপাধি এবং ‘সাহিত্যবিশারদ’ হচ্ছে সুধী সমাজের পক্ষ থেকে তাঁকে দেয়া সম্মান। তার পিতা মুনশী নুরউদ্দীন। তার মাতা মিস্রীজান পটিয়ার হুলাইন গ্রামের প্রখ্যাত পাঠান তরফদার দৌলত হামজা বংশের মেয়ে ছিলেন। জন্মের কয়েক মাস আগে পিতার মৃত্যু এবং ১৭ বছর বয়সে মাতৃহীন আবদুল করিম দাদা-দাদি ও চাচা-চাচির স্নেহছায়ায় এন্ট্রান্স পাস করেন এবং সচেষ্টায় বাংলা, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাড়ির দহলিজেই। সেখানেই তিনি আরবি-ফারসি ও বাংলায় পড়া শুরু করেন। অতঃপর তিনি সুচক্রদণ্ডী মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এক বছর পড়াশোনা করে তিনি ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য যে, এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তার দ্বিতীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত এবং সঙ্গত কারণেই উনিশ শতকে এন্ট্রান্স পাস করতে ইংরেজি ভাষাজ্ঞানেও পারদর্শী হতে হতো। চট্টগ্রাম কলেজে দু’বছর এফএ পড়ার পর ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সামগ্রিক ভাবে চরম অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক অসুস্থতা। পরীক্ষার আগে তিনি টাইফয়েড এ আক্রান্ত হন। ফলে তার আর এফএ পরীক্ষা দেয়া হয়নি।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাল্যকাল থেকেই পুঁথিপত্রের প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। সারা জীবন তার নেশা ছিল দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক ইত্যাদি পত্রিকা পাঠ করা এবং সংগ্রহ করা। তিনি তাঁর বাড়িতে তাঁর পিতামহ কর্তৃক সংগৃহীত কিছু পুঁথির সঙ্গে পরিচিত হন। এই পুঁথিগুলো পড়ে তিনি পুঁথি সংগ্রহে ও এ নিয়ে লিখতে আগ্রহী হন। এ পুঁথিগুলোর মধ্যেই পেয়ে যান ‘চণ্ডীদাসের পদাবলী’। সেসময় তিনি ছিলেন এফএ ক্লাসের ছাত্র। এ সময় তিনি আচার্য অক্ষয় সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় ‘প্রাচীন পদাবলী’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধ পাঠ করেই মহাকবি নবীন চন্দ্রসেন সাহিত্যবিশারদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবনের শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি সীতাকুণ্ড মধ্য ইংরেজি স্কুলের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষক হন। চট্টগ্রামে প্রথম সাব-জজ আদালতে শিক্ষানবীশ হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। পরে কবি নবীন সেনের পরামর্শ এবং সুপারিশে চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে যোগদান করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আজীবন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। বাঙালি লেখকেরা যখন পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে ও অনুরাগে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তখন প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ এবং পুঁথি সম্পাদনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মূলত পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ ও পুঁথি সম্পাদন ছিল তার জীবনের ব্রত। বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রধান উপাদান পুঁথি পত্র ও এদেশের প্রাচীন ও মধ্য যুগের লৌকজ-সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সম্পাদিত নরোত্তম ঠাকুরের ‘রাধিকার মানভঙ্গ’, কবিবল্লভের ‘সত্যনারায়ণের পুথিঁ’, দ্বিজ রতিদেবের ‘মৃগলুব্ধ’ রামরাজার ‘মৃগলুব্ধ সম্বাদ’, দ্বিজ মাধবের ‘গঙ্গামঙ্গল’, আলী রাজার ‘জ্ঞানসাগর’, বাসুদেব ঘোষের ‘শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস’, মুক্তারাম সেনের ‘সারদামঙ্গল’, শেখ ফয়জুল্লাহর ‘গোরক্ষবিজয়’ ও আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ (খণ্ডাংশ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশিত। ‘ইসলামাবাদ’ (চট্টগ্রামের সচিত্র ইতিহাস) ও ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গলা সাহিত্য’ (মুহম্মদ এনামুল হকের সহযোগে রচিত) তাঁর দুটি মৌলিক গ্রন্থ।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো নিষ্ঠাবান পুঁথি সংগ্রহকারী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আর একজনও নেই। কারো ঘরে পুঁথি আছে শুনলেই তিনি তাদের দ্বারে গিয়া পুঁথি দেখতে চাইতেন। অনেকে তাঁকে একটু দেখতেও দেন নাই, অনেকে আবার তাঁর কাকুতি মিনতিতে অনুয় বিনয়ে নরম হয়ে নিজে পুঁথি খুলে পাতা উল্টে দেখিয়েছেন, মুন্সী সাহেব দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে হস্তস্পর্শ না করে কেবল চোখে দেখে নোট করে সেই সকল পুঁথির বিবরণ লিখে এনেছেন, এত অধ্যবসায়, এত আগ্রহ, এত ভালবাসা। মুন্সী সাহেবের নিকট বাংলা সাহিত্য সমাজের কৃতজ্ঞতার পরিমাণ যে কত বেশী, তা এই বিবরণ হতে অনুমান করা যায়।

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ উনিশ-বিশ শতকের রেনেসাঁর মানসপুত্রদের একজন। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, তাঁর সময়ে উপমহাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক চেতনায় কণ্টকিত হয়েছিল। কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ওই পঙ্কিল স্রোত কলুষিত করতে পারেনি। তিনিই একমাত্র মুসলিম লেখক, যিনি হিন্দু মুসলিম সমাজে সমভাবে ছিলেন পরিচিত এবং স্বীকৃত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*